ফিরোজ কবির আকন্দ: পিআর পদ্ধতি আধুনিক গণতন্ত্রে একটি নবতর সংযোজন। গণতন্ত্র বর্তমান সময়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও ফল প্রসূ শাসন ব্যবস্থা। বাংলাদেশে পিআর পদ্ধতির আলোচনা জোরে শোরে আসে ২৪ এর বিপ্লবোত্তর সময়ে। আজকাল বিভিন্ন সভা সেমিনার রাজনৈতিক নেতৃবর্গের আলোচনায় “টক শো” ইত্যাদিতে এটি একটি বাহুল আলোচিত বিষয়। এ বিষয়ে আমরা ও অল্প-বিস্তর ভেবে দেখি।
পিআর পদ্ধতির সুবিধা হলো-সকল জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিই আইন সভায় থাকে। ফলে মেজরিটি মাইনরিটি সকলের কল্যাণের কথাই আলোচিত হয়। বর্তমানে বিশ্বে খুব অল্প দেশেই এটি চালু আছে। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদেও মহিলা আসনের ক্ষেত্রে ইতো মধ্যেই পিআর পদ্ধতি চালু আছে। এক্ষেত্রে নির্বাচনে কালো টাকার প্রভাব কমবে। নির্বাচর্নী ব্যয় কমবে। মানি ও মাসলম্যান এর ব্যবহার কমবে।
এ পদ্ধতির অসুবিধা হলো আমাদের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে জনগণ শুধু ভোট প্রদানের দিনই ক্ষমতা পায় বাকী ৫ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকে। এজন্য তারা চায় তার এলাকার একজন ভাল লোক পছন্দের লোক সংসদ সদস্য নির্বাচিত হোক যদি পিআর পদ্ধতি চালু হয়। তাহলে নির্দিষ্ট এলাকার জনগণ তার পছন্দের লোককে এমপি হিসাবে নাও পেতে পারে। ব্যাপারটা হবে জনগণ ভোট দেবে সদ্বীপে, নেতা হবে মালদ্বীপে। কারণ নিকট অতীত আমাদের জনগণকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, প্রতিনিধি মনোনয়ন দেয় রাজনৈতিক দল। সেক্ষেত্রে তারা দল ও জনগণের কাছে গ্রহণ যোগ্য ও জনপ্রিয় খোঁজার বদলে বিত্তশালী, ব্যবসায়ী, জনমনে ভয় সৃষ্টিকারী ব্যক্তি গুরুত্ব দেয়। প্রচলিত ভোটের মাঠে ভাললোক এবং জনপ্রিয়তার প্রয়োজন পরে; শুধু মাত্র দল কাউকে জেতাতে পারেনা। কিন্ত পিআর পদ্ধতিতে জনগণ দলকে/দলীয় প্রতীককে ভোট দেবে, প্রার্থীকে নয়। কিন্ত তিনি জানতে পারবেন না। তার ভোটে কে এম,পি হবেন? অর্থাৎ ভোটের পর রাজনৈতিক দল ঠিক করবে কোন এলাকায় কে এমপি হবেন।
দলীয় প্রধান সদস্য মনোনয়ন কিভাবে দিবেন?, কী দেখে দেবেন? পিআর পদ্ধতি হলে আনকন্ডিশনাল পাওয়ার হবে নেতার। বøাক মানি একজনের কাছে জমা হবে। অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হবে। দারিদ্র্যের দুষ্টু চক্র থেকে জনগণ বের হতে পারবে না, ফলে জাতীয় প্রবৃদ্ধি কম হবে। দেশ পিছনে যাবে। নিকট অতীতে রাজনৈতিক দল থেকে কিভাবে মনোনয়ন পাওয়া যায় তা নিয়ে জনগণের ধারণা সুখকর নয়। বাজারে নানান কথাই নিন্দুকেরা বলে যেগুলোর সত্যতা যাচাই করা যায় না, আবার সব্বৈ মিথ্যা তাও বলা মুশকিল। স্বতন্ত্র ভাবে বিভিন্ন আসনে ১০/১২ ভোট করে ১% ভোট পেলে কোন ৩ জন এমপিও হবেন? তবে সাদা চোখে মনে হয় “ডালমে কুচ কালা হ্যাঁয়”। আমি জন্মেছি এক অজ পাড়া গাঁয়ে, বসবাসও করি মফন্বল শহরে। যেখানে দেখেছি মানুষ চুপ থাকে, কারণ সত্য বচন বিপজ্জনক। যেখানে মুখে ও মুখোশের পার্থক্য চেনা দুষ্কর। মুখোশের পিছনে মুখগুলো চিৎকার করে, কিন্ত পর্দার সামনে হাসে। আমি দেখেছি নেতাদের (সকলের নয়) মুখোশের নিচে লোভের দাঁত, দেখেিেছ সাংবাদিকের কলম কিভাবে নিলামে ওঠে, কিভাবে চেতনাবাজীর আড়ালে আয়নাবাজী হয়। ধর্ম, রাজনীতি ও মিড়িয়ার অমর প্রেম! বর্তমান সময়ে সংষ্কার একটি অতি প্রয়োজনীয় ব্যাপার। এ প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দলগুলো সঠিক আচরণ করছে না বলে জনগণ মনে করছে। পিআর পদ্ধতির চেয়েও ভাল বিকল্প হতে পারে ১৯০৯ সালের লর্ড মর্লে-মিন্টো আইন। এ আইনটি বলবৎ করা গেলে সকল সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি থাকবে এবং বিশেষ বিশেষ দলের ভোট ব্যাংক বলে যা শোনা যায়, তারও যবনিকা পতন হবে। আবার জাতীয় সংসদ ব্যতীত অন্যান্য ক্ষেত্রে এ পদ্ধতির প্রয়োগ হতে পারে। যেমন ছাত্র সাংসদ, সিনেট (উচ্চ কক্ষ), উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ বহুল প্রচলিত গণতন্ত্রে জনগণ তার নেতাকে নিজের করে পেতে চায়। পিআর পদ্ধতিতে জনগণের সাথে নেতার দূরত্ব তৈরী হবে বলে কেউ কেউ মনে করছেন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে নি¤œকক্ষে জাতীয় সংসদ সরাসরি পদ্ধতি ও উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতি চালু হলে বিষয়টির সুবিধা অসুবিধা জনগণ তুলনা করতে পারবে বলে মনে হয়।
লেখক ও কলামিষ্ট- মো. ফিরোজ কবির আকন্দ